বাংলাদেশে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বিপুল জীবাশ্ম জ্বালানি–নির্ভর বিনিয়োগ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পরিবেশগত ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে নতুন এক প্রতিবেদনে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। একইসাথে ব্যাপক সম্ভাবনা সত্বেও নবায়নযোগ্য খাতে ব্যাংকটির বিনিয়োগ উদাসীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বক্তারা।
রোববার বাংলাদেশ এনার্জি কনফারেন্স ২০২৫–এর দ্বিতীয় দিনের এক সেশনে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। রাজধানীর বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘরে তিনদিনব্যাপী এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
“বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বহুজাতিক ব্যাংক” শীর্ষক প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন এনজিও ফোরাম অন এডিবির কো–অর্ডিনেটর শারমিন আক্তার বৃষ্টি। সেশনটি পরিচালনা করেন সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক রায়ান হাসান। তিনি বলেন, এডিবির “একপেশে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিনিয়োগ মডেল” বাংলাদেশকে জ্বালানি ঘাটতি, বাড়তি ঋণঝুঁকি ও জলবায়ু–বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
একইদিন বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা ও সমস্যা শীর্ষক আরেকটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা সত্বেও নীতিগত নানা বাধায় এ খাতের সম্প্রসারণ আশানুরুপ হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন বক্তারা।
আর্থের নির্বাহী পরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সোলার স্থাপনাগুলো বাড়ির ছাদে থাকা সোলার সিস্টেমের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু প্রায় ৯০% ঘরভিত্তিক রুফটপ সোলার সিস্টেম কার্যকর নয়—এগুলো মূলত নীতি পূরণের জন্য ইনস্টল করা হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়। যদি এই সিস্টেমগুলো সঠিকভাবে কাজ করত, তবে জাতীয় গ্রিডে গুরুত্বপূর্ণ পরিমাণ বিদ্যুৎ যোগ করা যেত।”
বাংলাদেশ সোলার এন্ড রিনিউয়েবল এনার্জি এ্যাসোসিয়েশন এর প্রেসিডেন্ট মোস্তাফা আল মাহমুদ বলেন, “নবায়নযোগ্য শক্তিতে অর্থনৈতিক রূপান্তর সার্থক করতে শক্তিশালী আর্থিক প্রণোদনার প্রয়োজন, কারণ সৌরবিদ্যুতের প্রাথমিক ব্যয় অনেক বেশি।
এছাড়া সিস্টেমের ভেতরেও অদৃশ্য বাধা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কয়েক মাস আগে সৌর প্যানেল ও যন্ত্রপাতির শুল্ক কমানোর জন্য একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এটি নির্দেশ করে যে, অগ্রগতির পথে সক্রিয়ভাবে বাধা দিচ্ছে কিছু শক্তি।”
এনজিও ফোরামের প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় মোট ৫৭০টি জ্বালানি প্রকল্পে ৯২.১ বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতির মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে ১৭.৩৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৩৬টি গ্যাসকেন্দ্রিক প্রকল্পে রয়েছে ৫.৯৯৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, যা দিয়ে ৩,৬৫৯ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে এডিবির গ্যাস খাতে অর্থায়নের ৬০ শতাংশ এসেছে টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স স্পেশাল ফান্ড (TASF) থেকে, ৩৬ শতাংশ উচ্চ সুদের ওসিআর ঋণ থেকে এবং মাত্র ৪ শতাংশ এডিএফ তহবিল থেকে।
১৯৭৭ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এডিবি গ্যাস পরিকল্পনা, সিস্টেম উন্নয়ন ও পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান নিয়ে কাজ করলেও ২০০০ সালের পর সরাসরি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে জোর দেয়। সিরাজগঞ্জ ও মেঘনাঘাট ৪৫০ মেগাওয়াট প্লান্টের টেন্ডারও পরিচালনা করে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, এডিবি বাংলাদেশে যে বিনিয়গ করছে তার বড় অংশই যাচ্ছে গ্যাস সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে। ১.২৩২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে, ১.১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণে, ৭০৩.৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে গ্যাস খাত উন্নয়নে, ৬৬০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে পরিকল্পনা খাতে, ৬০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যানে এবং ১.৩৯৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে অন্যান্য গ্যাস–সম্পর্কিত প্রকল্পে।
সরকারি খাতের চারটি প্রকল্প পেয়েছে ৮১৭ মিলিয়ন ডলার, আর বেসরকারি খাতের ৪১৫ মিলিয়ন ডলার গেছে জিইই, পেন্ডেকার, সামিট, জেরা-রিলায়েন্স ও এনডব্লিউপিজিসিএল এর প্রকল্পে।
নিষ্ক্রিয় প্রকল্প, বাড়তি ঋণঝুঁকি গ্যাস সংকট ও পাইপলাইন অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে এডিবি-অর্থায়িত রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট ও রিলায়েন্স মেঘনাঘাট ৭১৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র নির্মাণ শেষ হয়েও চালু হয়নি।
বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও এসব প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশকে ওসিআর ঋণের আওতায় উচ্চমাত্রার ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে—যা অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়াচ্ছে।
রায়ান হাসান বলেন, “এই কেন্দ্রগুলোই জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার সবচেয়ে ব্যয়বহুল উদাহরণ—বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তুত, কিন্তু জ্বালানি নেই।”
পিপিএ এবং ইআইএ অনুযায়ী, এডিবি–সমর্থিত পাঁচটি কেন্দ্রের মোট জীবনচক্রের কার্বন নিঃসরণ দাঁড়ায়—
১৭৪.৭১ মিলিয়ন টন CO₂।
এগুলো মেঘনা, মেঘনাঘাট ও ভৈরব নদীর তীরে ১৬০ একরের বেশি জমি দখল করেছে, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠী জীবিকা হারানো, বাস্তুচ্যুতি ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে।
এডিবির ঋণ গ্যাস খাতে ৯১.৩৪% গেলেও নবায়নযোগ্য খাত পেয়েছে মাত্র ৮.৬৬%।
প্রতিবেদন অনুযায়ী—সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ: ১১৮ মিলিয়ন ডলার যার মোট সক্ষমতা: ২২৫.৮ মেগাওয়াট। এছাড়া বায়ু বিদ্যুতে বিনিয়োগ একেবারেই শুণ্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এডিবি তাদের ২০২১ এনার্জি পলিসিতে চারটি সংশোধন আনে—
১) পারমাণবিক অর্থায়ন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
২) ক্রিটিক্যাল মিনারেল সরবরাহ শৃঙ্খলা সমর্থন
৩) কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তি অনুমোদন এবং ৪) তেল–গ্যাস খাতে মিথেন লিকেজ ও ফ্লেয়ারিং কমাতে অর্থায়ন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব সংশোধন উচ্চব্যয় ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তির দিকে ঝোঁক বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয়—যে সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রয়োজন কম ব্যয়, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ।
Leave a Reply