সম্প্রতি উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) “মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের মহাপরিকল্পনা (মিডি): বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে জাইকার পুনঃআধিপত্য”- শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করেছে যে, জাপান সমর্থিত মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম (মিডি) এবং এর সঙ্গে যুক্ত মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (মিডা) কর্তৃক গৃহীত প্রজ্ঞাপন স্থানীয় মানুষ, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং প্রশাসনের জন্য কতটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনের প্রধান উদ্বেগের বিষয়সমূহ:
১। অবৈধ প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানগত সংঘাত
নির্বাচিত স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোকে উপেক্ষা করে, একটি বিকল্প প্রশাসনিক শক্তি তৈরি করছে যা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাথে সংঘাত সৃষ্টি করছে।
২। অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও বাজেট ঝুঁকি
মিডি মহাপরিকল্পনা জাপান-সমর্থিত জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) দ্বারা প্রভাবিত, যেখানে সম্ভাব্য সৌর ও বায়ু শক্তির বিকল্প উপেক্ষা করে এলএনজি-ভিত্তিক প্রকল্প বেছে নেওয়া হয়েছে। এটি বাংলাদেশের শিল্পভবিষ্যতকে এলএনজি বাজারের অস্থিরতার সাথে যুক্ত করছে এবং জাপানের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও জ্বালানি ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল করছে। ইতিমধ্যে গ্যাসের মূল্য ১৭৯% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
৩। পরিবেশগত বিপর্যয়
এলএনজি ও জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণের কারণে ১৩০ কোটি টনের কার্বন নিঃসরণ হতে পারে। কোহেলিয়া নদী ব্যাহত হয়েছে, বন্যা পরিস্থিতি তীব্র হয়েছে, এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি যেমন স্পুন-বিল্ড স্যান্ডপাইপারসহ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে।
৪। সামাজিক অন্যায় ও স্থানান্তর
মিডি মহাপরিকল্পনা ১২,৯৫১ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, যা আনুমানিক ১,১৬,০০০ জন মানুষের পুনর্বাসনের কারণ হবে। লবণ খনি ও চিংড়ি খামার ধ্বংস হওয়ায় স্থানীয়দের জীবিকা বিপন্ন হচ্ছে। প্রতিবেদনে অভিযোগ উঠেছে, ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়ায় স্থানীয়রা ৩০% পর্যন্ত ভর্তুকি দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রতিবেদনের মূল সুপারিশসমূহঃ
নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের পরিকল্পনামূলক ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রজ্ঞাপন বাতিল করা। বর্তমান মহেশখালী-মাতাবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন (মিডি) মহাপরিকল্পনা বাতিল ও কয়লা ও এলএনজি-কেন্দ্রিক নীতি প্রত্যাখ্যান।
১)নির্বাচিত স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর পরিকল্পনামূলক ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (মিডা) অর্ডিন্যান্স বাতিল করা।
২) বর্তমান মিডি মহাপরিকল্পনা বাতিল করা এবং এলএনজি-কেন্দ্রিক নীতিগুলো প্রত্যাখ্যান করা।
৩) অঞ্চলের সৌর ও বায়ু শক্তি সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৪) নাগরিক সমাজের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে স্বতন্ত্র স্ট্র্যাটেজিক এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট পরিচালনা করা।
৫) কোহেলিয়া নদী পুনরুদ্ধার করা এবং পরিবেশগত ক্ষতি প্রতিরোধে ইকোলজিক্যাল ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৬) স্বচ্ছ ও অধিকারভিত্তিক পুনর্বাসন কাঠামো না থাকা পর্যন্ত আরও জমি অধিগ্রহণে স্থগিতাদেশ আরোপ করা।
প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি) এর সদস্য সচিব হাসান মেহেদী বলেন, “জাপান-সমর্থিত মহেশখালি-মাতারবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম মহাপরিকল্পনা একটি জটিল ফাঁদ, যা বাংলাদেশের জমি, সম্পদ ও সার্বভৌমত্বকে শোষণ করছে, এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে পরিবেশগত ও ঋণজনিত ফলাফলের বোঝা বহন করতে বাধ্য করছে।”
এই প্রতিবেদনটি সরকার, নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজের কাছে স্থানীয় কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার, জীবন-জীবিকা রক্ষা ও বাংলাদেশের পরিবেশ ও শক্তি স্বয়ংসম্পূর্ণতা রক্ষার জন্য তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে। এই সমস্যাগুলোকে মাথায় রেখে গত বুধবার মহেশখালীর-মাতারবড়িতে সাধারণ জনগণের সম্পৃক্ততায় এবং সংশপ্তক, ক্লিন ও বিডব্লিউজিইডি এর উদ্যেগে একটি প্রতিবাদ সমাবেশের ও আয়োজন করা হয়।
Leave a Reply